October 21, 2020

সাংসদের মুখে অশালীন ভাষা কখনোই কাম্য নয়

কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী:

ফরিদপুরে চরভদ্রাসন উপজেলার উপনির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্নের পদক্ষেপ নেয়ায় জেলার সরকারী কর্মকর্তাদের অশ্রাব্য গালিগালাজে চরম অপমান-অপদস্তই হতে হয়নি; তাদেরকে সরকারী গুন্ডা হিসেবে উল্লেখ করে প্রকাশ্য সমাবেশে ‘দাতভাঙা জবাব’ দেয়ার হুমকি এমনকি অনুসারীদের নিয়ে সরকারী কার্যালয় ঘেরাও করার হুমকি দেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে। ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন কর্তৃক প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে এহেন ন্যাক্কারজনক আচরণ করা হয়েছে। একজন সংসদ সদস্য যিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা তার দ্বারা এহেন আচরণ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাঝে চরম উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। জনগণকে ভুল বার্তা দিয়ে তাদের ক্ষেপিয়ে তোলা কোন সাংসদের কাজ নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে সঙ্গত কারণেই জনমনে তিব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকারের সভাপতিত্বে গত রোববার অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় এবিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।  সভায় উপস্থিত সদস্যগণ এব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ওই সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার চাহিদার প্রেক্ষিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে দুই দফায় ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করা হয়। তারমধ্যে একজন অসুস্থ্য থাকায় ১১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার দ্বায়িত্ব পালন করেন।

এ নির্বাচনে ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করায় ফরিদপুর-৪ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন ৯ অক্টোবর সকাল সোয়া ৮টার দিকে জেলা প্রশাসককে ফোন করে কৈফিয়ত তলব করেন এবং অধিক সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করার কারণে তার সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয় হলে মহাসড়ক অবরোধসহ নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তাঁকে নির্বাচন কমিশনের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে নানা ধরনের অশোভন মন্তব্য করেন। চরভদ্রাসনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথেও অনুরুপ আচরণ করেন যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে অবহিত করেন।

১০ অক্টোবর যথারীতি নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরীর সমর্থিত প্রার্থী ১১হাজার ভোটে জয়লাভ করেন। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী জনসভায়  রাত সাড়ে ৮টার দিকে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘণ করে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী প্রার্থী মোঃ কাউছার এবং সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরী ও তাঁর অনুসারীরা নির্বাচনে ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করার বিষয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসনের প্রতি চরম বিদ্বেষ এবং দ্বায়িত্বপালনরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অত্যন্ত মানহানিকরভাবে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি প্রদর্শন করেন এবং তাঁর অনুসারীদের দিয়ে বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ শ্লোগান দেওয়ায় যা একজন মাননীয় সংসদ সদস্য অথবা একজন সুস্থ্য মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এতদ্ব্যতিত তিনি নির্বাচনকালীন দ্বায়িত্ব পালনরত একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ভাঙ্গা কর্তৃক নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘণ করায় একজন ব্যক্তিকে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য আটক রাখার কারণে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ভদ্রলোকের পক্ষে উচ্চারণ অনুপযোগী অত্যন্ত অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ‘ম্যাজিস্ট্রেটরা ভবিষ্যতে তার নেতাকর্মীদের কোন কাজে বাঁধা দিলে ম্যাজিস্ট্রেটদের হাত পা ভেঙ্গে দেয়া হবে’ বলে হুমকি দিয়েছেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।

সভায় উপস্থিত সদস্যগণ একমত পোষণ করেন যে, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত মানহানিকর ও অশোভন উক্তি জেলা পর্যায়ে সদাশয় সরকারের সকল ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সমন্বয়কারী জেলা প্রশাসনের মত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। এ ধরনের হীন বক্তব্য স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে একদিকে যেমন সরকারের সার্বিক সাফল্য সম্পর্কে ভুল বার্তা প্রেরণ করে অপরদিকে মাঠ প্রশাসনে সততা ও নিরপেক্ষতার সাথে দ্বায়িত্ব পালনের পথেও চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনার কোন প্রতিকার না হলে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেবৃন্দ ইলিশ সংরক্ষণ, বাল্য বিবাহ নিরোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, সরকারী খাস জমি পুনরুদ্ধার, মাদক বিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন সামাজিক অন্যায় ও অনিয়ম প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এ ব্যাপারে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সভায় উপস্থিত সদস্যগণ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একইসাথে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সংসদ সদস্য কর্তৃক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ ও হুমকির অডিও ক্লিপ এবং সেইসাথে প্রকাশ্য সমাবেশে জেলা ম্যাজিস্ট্রেসিকে হুমকির ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

সংসদ সদস্যগণকে বলা হয় আইন প্রণেতা। তাদের নামের আগে মাননীয় বলা হয়। রাষ্ট্রের একজন আইন প্রণেতা তাঁর দ্বারা এহেন ন্যাক্কারজনক অশোভন আচরণে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত প্রশাসনিক কর্মকান্ড ভেঙে পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। জনগণকে অস্থায় নিতে এবং প্রশাসনের কর্মকান্ড নির্বিঘ্ন করার স্বার্থেই বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান জরুরি হয়ে পড়েছে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সংসদ সদস্যদের আচরণ সম্পর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কমিটি অন স্ট্যান্ডার্ড ইন পাবলিক লাইফ’ তার পঞ্চম প্রতিবেদনে সাতটি মানদন্ড চিহ্নিত করেছে সংসদ সদস্যদের জন্য এগুলো হলো: (ক) নিঃস্বার্থতা, (খ) সত্যনিষ্ঠতা বাসাধুতা, (গ) বস্তুনিষ্ঠতা, (ঘ) দায়বদ্ধতা, (ঙ) উন্মুক্ততা বা মুক্তমনা, (চ) ন্যায়পরায়ণতা ও (ছ) নেতৃত্ব । আর ভারতীয় লোকসভার সদস্যদের জন্য প্রণীত আচরণবিধিতে আরও দুটি মানদন্ড যুক্ত করা হয়: জনস্বার্থ ও দায়িত্ব।

বাংলাদেশে এই ধরনের কোন আচরণ বিধি এখনো নেই। কিন্তু একজন সংসদ সদস্যের কাছে জনগণ প্রথমত: আশা করে ভালো ব্যবহার, নিরাপত্তা ও সুবিচার। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে এই তিনটি জিনিসের বড়ই অভাব। সংসদ সদস্যদের মুখের ভাষা শুনলে সাধারণ জনগণ মনে করেন তারা খারাপ ব্যবহার করার জন্যই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া জনগণকে ভুল বার্তা দিয়ে তাদের ক্ষেপিয়ে তুলে অন্যায় কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নও একজন আইন প্রণেতার লক্ষ্য হতে পারেনা। এটি কোন গণতন্ত্রপ্রেমী নেতার আচরণ হতে পারে না। এই প্রবণতা কখনোই কাম্য নয়। কারণ জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহারের মাধ্যমেই সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।

Please follow and like us
error0
Tweet 20
fb-share-icon20