September 25, 2020

‘জয় বাংলা’ শ্লোগান ভালবেসে বারবার নির্যাতিত ছাত্রলীগের শামীম তালুকদার যুবলীগের নেতৃত্বে আসছেন

Shameem Talukder

শামীম তালুকদার। ছবি- ফরিদপুর টাইমস।

বিশেষ প্রতিবেদক, ফরিদপুর টাইমস:

ফরিদপুরের এককালের সম্ভাবনাময় মেধাবী তরুণ ছিলেন। ঢাকার একটি ক্রিকেট দলের হয়ে ফাস্ট ডিভিশন লীগের খেলোয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। শত্রুরা তাঁর সেই স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে। তার উপর নেমে এসেছে একের পর এক আঘাত ও নির্মম নির্যাতন। ফরিদপুরের নির্ভিক সাংবাদিক গৌতম দাসকে হত্যাকারী সন্ত্রাসী বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন তাঁকে এজন্য অসহ্য শারিরীক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। শরীরের বিভিন্নস্থানে শত্রুর ধারালো অস্ত্রের আঘাতের দগদগে চিহ্ন আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। এখনো হাটতে চলতে তাঁকে এক পা টেনে টেনে যেতে হয়। সেদিনের সম্ভাবনাময় সেই যুবকের আজকের এই পরিণতির কারণ- তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে ‘জয় বাংলা: স্লোগানকে ভালবেসেছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যোগ দিয়ে প্রতিপক্ষের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন। শুধুমাত্র বিরোধী রাজনৈতিক দলেরই নয়, নিজ দলের প্রতিপক্ষেরও ভয়ংকর টার্গেট হতে হয়েছে তাঁকে। বারবার হামলা ও হুমকির সম্মুখিন হয়েছেন তারপরেও চরম শত্রুদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এখনও সক্রিয় তিনি রাজনীতির মাঠে। ইতিমধ্যে তার দুর্দান্ত সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে রাজপথে ব্যাপক সাড়াও ফেলেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত থেকে নজর কেড়েছেন প্রবীণ রাজনীতিকদের।

বলছিলাম ফরিদপুরের ছাত্রলীগের সাবেক সাহসী নেতা শামীম তালুকদারের কথা। ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার সম্পৃক্ততা আজ থেকে দুই যুগেরও বেশি সময়কাল আগে সেই স্কুল জীবন থেকে।

শহরের কমলাপুর মহল্লার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর পিতা মরহুম শাহজাহান তালুকদার ছিলেন জেলা ফরিদপুরের একজন পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবসায়ী। ফরিদপুর জেলা বাস মালিক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯ বছর এ পদে ছিলেন। এছাড়া দীর্ঘকাল যাবত দক্ষিণবঙ্গ বাস মালিক সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সংগঠনের সহ-সভাপতি ছিলেন।

শামীম তালুকদার নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থাতে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে কোচ মোখলেসুর রহমান বাবলুর নিকট ক্রিকেট অনুশীলন করতেন। এসময় স্টেডিয়ামের বাইরে পাশের রাজেন্দ্র কলেজের মাঠেও তাদেরকে ক্রিকেটের অনুশীলনের জন্য নিয়ে যেতো। সেসময়ে রাজেন্দ্র কলেজে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের প্রতিদ্বন্দ্বি ছাত্র সংগঠন হিসেবে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছিলো ছাত্রলীগ।

শামীম বলেন, রাজেন্দ্র কলেজের ক্রিকেটের মাঠ থেকে তখন ছাত্রলীগের মিছিল দেখতাম। সেই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান হতো। যখনই সেই স্লোগান শুনতাম নিজের মধ্যে অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করতো। এক অন্যরকম ভালাবাসা ও আবেগে ক্রিকেটের মাঠ ছেড়ে মাঝেমধ্যে ছুটে যেতাম সেই জয় বাংলার মিছিলে। সেই থেকে রাজনীতির মাঠে যাত্রা শুরু।

তখন রুকসুর জিএস ছিলেন ছাত্রলীগের জিয়াউল হাসান মিঠু। আর এই জিয়াউল হাসান মিঠুর ছোট ভাই কেটু ছিলেন শামীমের স্কুল জীবনের বন্ধু।

শামীম বলেন, এসময়ে একদিন বন্ধু কেটুর মাধ্যমে পরিচয় হয় জিয়াউল হাসান মিঠু ভাইয়ের সাথে। রুকসুর ক্যাম্পাস তখন মাঝেমধ্যেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতো ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে। সেই স্কুল পড়ুয়া ছাত্র থাকাকালেই তখন বড় ভাইদের সাথে ছাত্রলীগের হয়ে দাড়িয়ে যেতাম ছাত্রদলের মোকাবেলায়। একারণে সেই শেশব থেকেই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের চক্ষুশুল হয়ে যান তিনি।

একজন ক্রিকেটার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার বিভোর স্বপ্নে ৯৫ সালে এসএসসি পাশ করে শামীম চলে যান ঢাকায়। সেখানে প্রথম বিভাগে খেলার সুযোগের আশায় নাম লেখান ঢাকার ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে। পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন ঢাকার হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে।

১৯৯৬ সালের ১৫ আগষ্ট কমলাপুর বটতলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে শোক দিবস পালনের কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। তার আগে ১৪ আগষ্ট রাতে চাঁদমারী ঈদগাহ ময়দানে চলছিল পরবর্তী দিনের কাঙ্গালী ভোজের আয়োজন। শোক দিবসের সেই আগের রাতেই শামীমের জীবনে নেমে আসে সেই নির্মম কালো অধ্যায়।

শামীম বলেন, ১৪ আগষ্ট রাতে তিনি ঈদগাহ মাঠে খড়ের পালার পাশে বসে ছিলেন। তিনি একটু আগেই সেখানে যান। বন্ধুরা একেক করে আসার কথা ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে সেখানে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীরা। যারা পরবর্তীতে ফরিদপুরের সাংবাদিক গৌতম দাসকেও নৃশংসভাবে হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা তাকে নিরস্ত্র ও একা পেয়ে প্রথমে হকিষ্টিক ও লাঠিশোঠা দিয়ে পিটিয়ে দুর্বল করে তারপর উপর্যপরী কুপিয়ে মৃত ভেবে ফেলে যায়। খবর পেয়ে সতির্থরা তাঁকে সেখান হতে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়।

সন্ত্রাসীদের রামদা, চাইনিজ কুড়াল ও ছ্যানের এলোপাথারী ৩২টি কোপের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যার তাঁর শরীর। তৎক্ষনাৎ ফরিদপুরের হাসপাতালে নেয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, এতোগুলো কোপের একটি ধারালো কোপে শামীমের ফুসফুস ছিদ্র হয়ে গেছে।

শামীম বলেন, দীর্ঘদিন অসুস্থ্য থাকার পর আল্লাহ অশেষ রহমতে চিকিৎসায় তিনি কিছুটা সুস্থ্য হয়ে উঠেন। সন্ত্রাসীদের এই হামলায় তাঁর প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগে খেলার স্বপ্ন তছনছ হয়ে যায়। ব্যাহত হয় শিক্ষাজীবন। ২০০৪ সালে আবারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের টার্গেট হন শামীম। সন্ত্রাসীরা তাঁকে হত্যার জন্য রুকসুর ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিলো। পথে শহরের ঝিলটুলী মাতৃমঙ্গলের সামনে দাড়িয়ে তাদের প্রতিহত করতে যান তাঁরই কলেজ জীবনের ছাত্রলীগের রাজনীতির একেবারেই ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা ও বন্ধু সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিশ্বজিৎ দাসগুপ্ত নাথু। সন্ত্রাসীরা সেদিন শামীমকে না পেয়ে নাথুকেই রক্তাক্ত কুপিয়ে যায়। এরপর হাসপাতালে তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান নাথু।

বিশ্বজিত দাস নাথু ও তিনি একইসাথে রাজনীতি করেছেন। তাঁরা দু’বন্ধু একইসাথে জেলা ছাত্রলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদের প্রার্থী ছিলেন। জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে শীর্ষ দুই ছাত্রনেতার মধ্যে পদ নিয়ে বিরোধ হওয়ায় দীর্ঘসময় আটকে যায় কেন্দ্রের অনুমোদন। এরপর পরিবারের চাপেই ২০০৪ সালে ট্যুরিজম এন্ড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ডিপ্লোমা পড়তে শামীমকে পাঠিয়ে দেয়া হয় সাইপ্রাসে। ২০০৬ সালে সেখান থেকে ফিরে ‘মারমেইড ক্যাফে’ নামে একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি চলে যান কক্সবাজারে।

শামীম তালুকদার বলেন, ফরিদপুরে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের নিকটতম প্রতিবেশী হয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ভালবাসার অপরাধে শুধু আমার উপরেই নয় আমার পরিবারের উপরেও নানাভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। বাসার টেলিফোন লাইন কেটে দিতো। বাড়িতে থাকতে পারিনি রাতের পর রাত। তবু জয়বাংলা স্লোগানকে ভালবেসে সেই যে রাজনীতির মাঠে যোগ দিয়েছিলাম তারপর আর কখনোই পিছপা হইনি।  বঙ্গবন্ধু ফ্যানস ক্লাব’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন তিনি। এখন সেই সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেন।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।  দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নিবেদিত নেতাকর্মীদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ নেতৃবৃন্দও মনে করছেন,  মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক শামীম তালুকদারের মতো পরীক্ষিতদের সমন্বয়ে নতুন করে দল গোছানোর উপযুক্ত সময় এখনই। দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর জেলা যুবলীগের আসন্ন সম্মেলনে শামীম তালুকদারদের মতো নেতাকর্মীদেরকেই মূল্যায়ন করা হবে।

দীর্ঘদিনের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এই পরীক্ষিত ও নিবেদিত সৈনিক শামীম তালুকদার বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতিতে নেমেছি। রাজনীতির নামে লুটেরা-দুর্বৃত্তদের প্রতিহত করে সুস্থ্য ধারার রাজনীতির চর্চাই আমার জীবনের লক্ষ্য। আমৃত্যু যেনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পারি সেই সুযোগ চাই। তিনি বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্ম ও যুবসমাজ যাতে অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উপযুক্ত হয়ে গড়ে উঠতে পারে সেজন্য তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। এজন্য তাদের পাশে থেকে আমৃত্যু কাজ করে যেতে চাই।

Please follow and like us
error0
Tweet 20
fb-share-icon20