জালিয়াতির মাধ্যমে বেদখল হয়ে যাচ্ছে ঈশান এস্টেটের কয়েক শ’ কোটি টাকার অর্পিত সম্পত্তি

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর টাইমস:

ফরিদপুরের ঈশান চন্দ্র দাস সরকারের পরিত্যক্ত কয়েক শ’ কোটি টাকার অর্পিত সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। ফরিদপুর শহরের ১১৮ নং মূল মৌজার ঝিলটুলী ও আলিপুর মহল্লার প্রায় ২০ একর জমিসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন মৌজার বিস্তীর্ন ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন তৎকালীন জমিদার এই ঈশান চন্দ্র দাস সরকার ও তার ভাই ইন্দু ভূষণ দাস সরকার। সরকারী রাজেন্দ্র কলেজ, জেনারেল হাসপাতাল, ঈশান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ফরিদপুর মিউজিয়াম, সাবরেজিষ্ট্রার কার্যালয়, জেলা খাদ্য কর্মকর্তার কার্যালয়, পাট কর্মকর্তার কার্যালয়, সরকারী তিতুমীর বাজার, চকবাজার ও নিউমার্কেট সহ বিভিন্ন স্থাপনা এই সম্পত্তিতে গড়ে উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ফরিদপুরের সাবেক দুইজন বিতর্কিত নেতার ক্ষমতাবলে এই সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১২ সাল হতে। যেখানে শহরের সবচেয়ে মূল্যবান ঝিলটুলী মহল্লার বেশিরভাগ জমি রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এব্যাপারে দুদকে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। ভূমি অফিস বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।

জানা গেছে, ঈশান এস্টেটের মালিক ঈশান চন্দ্র দাস সরকারের ছিল তিন পুত্র জ্যোতিশ চন্দ্র সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ সরকার ও সুরেশ চন্দ্র সরকার এবং তাঁর ভাই ইন্দু ভূষণ সরকারের ছিল তিন পুত্র সত্যভূষণ সরকার, ভক্তিভূষণ সরকার, শক্তি ভূষণ সরকার ও স্ত্রী নিলীমা সরকার। ৬২ সালের মধ্যে এরা সকলেই দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।

২০১২ সালে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তি আইনের পর ঈশান চন্দ্র দাস সরকারের উত্তরাধিকার দাবি করে সম্পত্তি অবমুক্তির আবেদন করেন জনৈক উজ্জল সরকার গং। তারা দাবির স্বপক্ষে ঈশান গোপালপুর ইউপির তৎকালীন চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান চৌধুরী পংকজ স্বাক্ষরিত একটি ওয়ারিশ সনদ দাখিল করেন। তাতে ঈশান চন্দ্র সরকারের ৬ পুত্র উল্লেখ করা হয়। যাদের একজন ক্ষিরোদ চন্দ্র সরকার। এই ক্ষিরোদ চন্দ্রের প্রপৌত্রদ্বয় উজ্জল সরকার, উৎপল সরকার ও উত্তম সরকার। নামজারির সময় ওয়ারিশ সনদ নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর সন্দেহ হলে সেটি পুনরায় যাচাইয়ের জন্য ইউপি চেয়ারম্যানের নিকট পাঠানো হয়। এরপরই বিশাল এই ভূসম্পত্তি আত্মসাতের বিষয়টি বেরিয়ে আসে।

ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম মজনু বলেন, ঈশান চন্দ্র সরকারের গোমস্তা ক্ষিরোদ চন্দ্রকে সন্তান সাজিয়ে পুরো সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি জানান, আরএস ও সিএস খতিয়ানের রেকর্ডপত্র, দলিল দস্তাবেজ ও মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে সবখানেই ঈশান চন্দ্র সরকারের তিন পুত্র থাকার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। ফরিদপুর সদর মুনসেফ আদালতে ১৯৬১ সালের ১৬/৬১ নং মামলায় দেখা যায় ডিক্রিদার পক্ষ হিসেবেও রয়েছে এই তিন পুত্রের নামই। এছাড়া ১৯৪৪ সালের জেলা রেজিষ্ট্রি কার্যালয়ে ঈশান চন্দ্র সরকারের পুত্রদের নামে তিনটি দলিল সম্পাদন হয় যেখানেও আর কারো নাম নেই।
এব্যাপারে নুরুজ্জামান চৌধুরী পংকজ বলেন, ইউপি মেম্বার প্রবীণ নাগরিকদের সাথে কথা বলে যেই প্রতিবেদন দিয়েছিলেন সে প্রেক্ষিতে ওয়ারিশ সনদ দেয়া হয়েছিল। এব্যাপারে ভূমি অফিসে আমাদের তলব করেছিল তবে যারা ওই সনদ নিয়েছিল তারা হাজির হননি।

এব্যাপারে উজ্জল সরকার নিজেকে ঈশান সরকারের বৈধ ওয়ারিশ দাবি করে বলেন, একটি পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ করছেন। যেসব সম্পত্তি দানকৃত সেসবে তাদের কোন দাবি নেই। বর্তমানে আমরা ছাড়া আর কোন বৈধ ওয়ারিশও নেই ঈশান চন্দ্র সরকারের। ভুমি অফিসের শুনানিতে অংশ নিতে তিনি সেখানে হাজির হয়েছিলেন বলে জানান।

এদিকে দুর্নীতির মাধ্যমে বিশাল ভূসম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা চেষ্টার বিষয়ে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন নিউ মার্কেটের ৯ জন ব্যবসায়ী। তারা অভিযোগ করেন, ঈশান বাবুর পরিত্যক্ত ‘ক’ তফশিলভুক্ত হাজার কোটি টাকার ভূসম্পত্তি দুর্নীতির মাধ্যমে পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাতের চেষ্টা চলছে। আর এতে লিপ্ত রয়েছেন উজ্জল সরকার গং। তাদের সহযোগী রয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান চৌধুরী পংকজ, তৎকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তহশিল পিওন ওবায়দুর সার্ভেয়ার মোঃ হারুন। ফরিদপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহ্ মোঃ সজীব জানান, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।