September 25, 2020

‘রিলিফ চাইনা, আমাগে কাম দ্যান’

বন্যায় ঘরবাড়ি পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় হরিসভায় বেরিবাঁধের উপর আশ্রয় নেয়া একটি পরিবার। ছবি- ফরিদপুর টাইমস।

হারুন আনসারী, ফরিদপুর:

সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়নের আদা মাতুব্বরেরডাঙ্গি গ্রামের কৃষক রজব আলী মাতুব্বর (৫৫) এক সপ্তাহেরও বেশি সময় যাবত পানিবন্দি থাকার পর এখন পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বেরিবাঁধের উপর উঁচু সড়কে। সেখানে পলিথিন আর বাশ দিয়ে পাটখড়ির বেড়া ঘিরে অস্থায়ী ছাউনি করে নিয়েছেন। স্ত্রী হাফেজা বেগম (৪৮) আর দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে একটি চকির উপরেই তার এই ঘর। পাশেই বেঁধে রাখেন তার সম্বল গরু আর আদরের বাছুর। ক্ষেতের কাজ করে গরু চড়িয়ে তার সংসার চলে। কিন্তু বন্যার পানিতে ঘর তলিয়ে যাওয়ায় এখন তিনি কর্মহীন।

‘চাইরদিকে পানি, কাজকাম পাইতেছিনা। পরিবারের বাল-বাচ্চা নিয়্যা নিদারুন কষ্টে দিন কাটাইতে হইতেছে। এহন আমাগে একটা কামের দরকার।’ বললেন তিনি। রজব আলী জানান, বেরিবাঁধে এসে আশ্রয় নেয়ার পর একবার মাত্র ইউপি চেয়ারম্যান এসে তাদের কিছু চাল দিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া আর কারো থেকে কোন সহায়তা পাননি। তবে এই সহায়তার চেয়ে তার রুটি রুজির জন্য কাজের বড় দরকার। বাচ্চু শেখের ভাষ্য হচ্ছে, ‘রিলিফ লাগবে না, আমার একটা কামের দরকার।’

রজব আলীর মতো অসংখ্য পরিবার নিম্ন আয়ের দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ বন্যায় শুধু আশ্রয়হীনই নয়, বরং তারা কর্মহীনও হয়ে পড়েছেন। সাম্প্রতিক করোনার ধকল কাটিয়ে না উঠতেই তাদের উপর এই বন্যার আঘাত যেনো মরার উপড় খাড়ার ঘাঁ’র মতো।

শহরের টিবি হাসপাতাল মোড় হাসপাতাল মোড় থেকে পূবদিকে চলে গেছে গুচ্ছ গ্রামের সড়ক। যেখানে শুধুই হতদিরদ্র পরিবারের বাস। এই বন্যায় ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় এসব পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু সড়কে। সেখানকার মানুষের দুর্ভোগ যেনো আরো বেশি। পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় সড়কে আশ্রয় নেয়া এক পরিবারের গৃহিনী আছিয়া বেগম বলেন, ‘ গত পাঁচদিন হইলো এহেনে (রাস্তায়) উঠছি। একবার চিড়্যা আর মুড়ি দিছিলো। তারপর আর কেউর দেখা নাই। এহন কি কইর‌্যা দিন চলবি আমাগের!

হাফিজা খাতুন নামে ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, পরিবারের হগলতিরে নিয়্যা আইজ প্রায় একসপ্তাহ রাস্তায় পইর‌্যা রইছি। আমাগের অবস্থা যেমন তেমন, গরু ছাগলের খাবারও জুটাইতি পারতেছি না। অবলা প্রাণির খিদের অভাবে চিৎকার পারে, সহ্য হয়না।

শহরের আলিয়াবাদ ইউনিয়নের বর্দ্ধিত পৌরসভার ২৫ নং ওয়ার্ডের হরিসভা মহল্লার বাসিন্দা ষাটোর্দ্ধ নারী নুরজাহান বেগম বলেন, ‘ হঠাৎ কইর‌্যা বানের পানিতে সাদিপুরে বাঁধ ভাইঙ্গ্যা ঘরবাড়ি তলায় যাওয়ার পর ঘরের মাল-ছামানাও কিছু বাইর করতি পারি নাই। পাঁচজন ছাওয়াল-মাইয়ার সাথে গরু-বাছুর নিয়্যা রাস্তার উপর পলিথিন আর বাঁশের বেড়া দিয়্যা ছাপড়া তুলছি। এখন কয়ডা টিন পাইলে ঘরডা তুলতি পারতাম।

পাশের মুন্সি ডাঙ্গি গ্রামের বাচ্চু শেখ (৫৩) জানান, গত প্রায় পনের দিন আগে তার বাড়িতে পানি প্রবেশ করে। এরপর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এক সপ্তাহ যাবত বেরিবাঁধের সড়কের উপর পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিচে সমানে পানি বাড়ছে আর উপর থিকেও সেইরম বৃষ্টি হইতেছে। পলিথিন আর চটা দিয়ে যেই মাঁচা বানাইছি সেইড্যা যে কহন বাতাসে উড়্যায় নেয় সেই চিন্তায়তেই ঘুম আসে না। তিনি জানান, স্ত্রী ও তিন সন্তানের সাথে পালের গরু, ছাগল ও হাসমুরগিও নিয়ে এসেছেন। এসব পশু প্রাণি নিয়েও তাদের দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

চলমান বন্যায় বানভাসী মানুষের মাঝে এখন শুধুই এমনই হাহাকারের চিত্র। গত দুই সপ্তাহযাবত পদ্মার পানিতে ফরিদপুরের সদর, চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলার চরাঞ্চলে প্রথমে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করে। এরপর গত চার পাঁচদিনে বিভিন্নস্থানে পানি বেড়ে যাওয়ায় ও বাঁধ ভেঙ্গে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে এসব উপজেলার আরো বিস্তীর্ণএলাকা। এছাড়া আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদের পানি বেড়ে বিভিন্ন খালনালা দিয়ে পানি প্রবেশ করেছে পার্শ্ববর্তী ভাঙ্গা ও নগরকান্দা উপজেলাতেও।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় এক লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল বুধবার হতে পদ্মা নদীর পানি একটু কমতে শুরু করেছে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বন্যার্তদের মাঝে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, বানভাসী মানুষদের জন্য বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫৫০ মেট্রিক টক চাল,৭ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও নগদ ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব সামগ্রী যা সংশ্লিস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, ত্রানের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। প্রয়োজনে বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে।

এপর্যন্ত ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম রেজা, চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমীন সুলতানা ও সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পূরবী গোলদারসহ ফরিদপুরের পৌর মেয়র শেখ মাহতাব আলী মেথু ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবী কয়েকটি সংস্থা রান্না করা খাবার বিতরণ ছাড়াও কয়েকটি অস্থায়ী টয়লেট করে দিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি মাহবুবুল হাসান পিংকু আলিয়াবাদ ইউনিয়নের সাদিপুর ও ফরিদপুর পৌরসভার বর্দ্ধিত ২৫ নং ওয়ার্ডের হরিসভায় প্রায় এক হাজার পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন।

এছাড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শওকত আলী জাহিদের নেতৃত্বে হরিসভা মহল্লার বেড়িবাঁধে প্রায় পাঁচ শতাধিক বন্যার্তদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করে।

Please follow and like us
error0
Tweet 20
fb-share-icon20