ফরিদপুরে কর্মহীন হয়ে পড়েছে সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারী ও দিনমজুর

হারুন আনসারী, ফরিদপুর টাইমসঃ

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ফরিদপুরে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। রাস্তাঘাটে টহল দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মানুষজনকে মাইকিং করে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না বেরোনোর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। ছোটপরিবহন গণপরিবহনগুলো চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজে চলছে ছুটি। অফিস-আদালত পাড়াতেও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নেই। ব্যস্ততম পথপ্রান্তর এতে জনশুন্যস্থানে পরিণত হয়েছে। আর একারণে সবচেয়ে বিরুপ প্রভাব দৈনিক ভিত্তিতে খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষের জীবনে।

জেলা জুড়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছে সাধারণ শ্রমিক ও দিন মজুরা। গত তিন দিন জেলার সদর থেকে শুরু করে উপজেলার সদরের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শহর গুলোতে জনসাধারণে চলাচলও সীমিত করা হয়েছে। ফরিদপুরে বাসস্ট্যান্ডে থেকে আভ্যন্তরীণ ও দুরপাল্লার সকল বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের তরফ হতে সকলকে বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে না বেরোনোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জেলা শহর ছাড়াও উপজেলা পর্যায়েও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরের শহরের জনতা ব্যাংক মোড়, প্রেসক্লাব চত্বর, আলীপুর মোড়, থানা মোড়, ভাঙ্গা রাস্তার মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, ব্যস্ততম এই এলাকাগুলো একেবারেই জনশুন্য হয়ে রয়েছে। দোকানপাট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ।

বুধবার বিকিলে রাস্তাঘাটে সীমিত আকারে বের হওয়া মানুষের উপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশনের পর বৃহস্পতিবার আর কেউ বেরোনোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে আটকে পড়া দিন মজুর নুরুল ইসলাম জানান, তিনি পাবনা থেকে এসেছেন। এসময় ফরিদপুরে পেঁয়াজ তোলার জন্য জনের দাম বাড়ে। তবে গতকাল হতে তিনি কাজ পাননি। নুরুল ইসলাম জানান, ‘আমার মতো অনেকেই এই শহরের কামলা দিতে এসেছে। কিন্তু দুয়েকদিন হলো কোনো কাজ পাইতেছিনা। বাড়ীও ফিরতে পারতেছিনা।’

জেলা সদরের উপকন্ঠের কানাইপুর এলাকা থেকে বাইসাইকেলে শহরে এসেছেন রাজমিস্ত্রী ইব্রাহিম (৪৮)। তিনি জানান, বুধবারও তিনি কাজে যেতে পেরেছিলেন। তবে আজ আর মালিক কাজে নেয়নি। দোকানপাট বন্ধ থাকায় নির্মাণ কাজও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এভাবে বেশিদিন চলতে পারবো না। না খেয়েই মরতে হবে।

‘এখনতো আর এনজিওর কিস্তিও পাচ্ছিনা যে ঋণ করবো। মানুষজনও ধার দিচ্ছেনা। এজন্য সামনের দিনগুলো টিকে থাকা কষ্টের হবে বলে জানালেন ইব্রাহিমের সাথে একই কাজে আসা আফসার শেখ (৫২)। তিনি বলেন, সবই দেখছি। কিন্তু বাড়িতে ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতেই কাজের জন্য বেরিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরতে হবে শুন্য হাতে। বাড়িতে গেলে ওদের কি বরবো সেটাই ভাবছি।

তিনি বলেন, সরকার কিংবা বিত্তবানরা আমাদের পাশে এগিয়ে না এলে আমাদের মতো মানুষ খাবারের অভাবে পড়বে।ফরিদপুরের সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জেলার ছোট-বড় গণপরিবহন চলাচল বৃহস্পতিবার থেকে সম্পূর্ণভাবেই বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এসব পরিবহণে কাজ করা শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পরেছে। এছাড়া দোকানপাট, মিলকারখানা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের কর্মচারীরাও কর্মহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। যতো সময় যাচ্ছে, তাদের দুর্ভাবনাও বাড়ছে সমান গতিতে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, এবিষয়ে সরকার ওয়াকিবহাল রয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে এই দূর্যোগের সমেয় অতিদরিদ্রদের তালিকা করে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার। আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছি। দুই এক দিনের মধ্যেই তাদেরকে খাদ্য সহায়তা প্রদান শুরু করবো।

ফরিদপুর জেলায় এখনো পর্যন্ত কোন করোনা ভাইরাস অঅক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেনি দাবি করে জেলা সিভিল সার্জন ডা. ছিদ্দিকুর রহমান জানান, জেলায় গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে ৭৯ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও এ পর্যন্ত বিদেশ ফেরত ১ হাজার ৪৭৬জন হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কার্যত জেলার সিংহভাগ মানুষই এখন ঘরবন্দি।