বহুল প্রতিক্ষিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর টাইমস:

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) খুলে দেওয়া হচ্ছে বহুল প্রতিক্ষিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার এর উদ্বোধন করবেন। এশিয়ান হাইওয়ে করিডর-১ এর অংশ এই এক্সপ্রেসওয়ের ঢাকা প্রান্ত হতে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। সদ্য নির্মিত এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সাধারণভাবে সময় লাগবে মাত্র ৪২ মিনিট। আর ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে যেতে সময় লাগবে ২৭ মিনিট। অবশ্য এখনই ঢাকা থেকে সরাসরি ভাঙ্গা পর্যন্ত যাওয়া যাবে না। পদ্মা সেতু হওয়ার পর এই সুফল ভোগ করা যাবে।

এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ব্যাবস্থাপক ও মুন্সিগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মোস্তফা জানান, রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল এই প্রকল্পের। মাওয়া থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ কাজ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার অংশের কাজ। চলতি মাসে এসে প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ হয়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৬ হাজার ২৫২ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরুর পর পরবর্তিতে সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৮৯২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর বাইরে মূল প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন কিছু কাজের জন্য পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জুনে চার হাজার ১১১ কোটি টাকার আরেকটি পৃথক ডিপিপি অনুমোদন করে সরকার। এই ডিপিপি অনুযায়ী কাজের মেয়াদ ধরা হয়েছে জুন ২০২০ সাল পর্যন্ত। দুটি ডিপিপি মিলিয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে মোট ব্যয় হচ্ছে ১১ হাজার ৩ কোটি টাকা। আট লেনের এই এক্সপ্রেসওয়েটি সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন-এসডব্লিউও (পশ্চিম)।

ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে থাকছে বেশ কয়েকটি বাস-বে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংযোগ সড়ক থেকে ঢোকা এবং বের হওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই এক্সপ্রেসওয়ের অনেকগুলো পয়েন্টে। তাই এটিকে পূর্ণাঙ্গ এক্সপ্রেসওয়ে বলা যাবেনা। তবে এক্সপ্রেসওয়ে বা হাইওয়ের অনেকগুলো সুবিধা পাওয়া যাবে এতে। অবশ্য পদ্মা সেতু চালু না হওয়া পর্যন্ত এই সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যাবেনা।

এ এক্সপ্রেসওয়ের মাঝ বরাবর রয়েছে ৫ মিটার প্রস্থের মিডিয়ান। নির্মাণ কাজ হয়েছে দুটি প্যাকেজে। প্রথম প্যাকেজে যাত্রাবাড়ী ইন্টারসেকশন থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার এবং দ্বিতীয় প্যাকেজে শরীয়তপুরের পাঁচ্চর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার। এই এক্সপ্রেসওয়েতে মোট সেতুর সংখ্যা হচ্ছে ৩১টি। এগুলোর মধ্যে পিসি গার্ডারের সেতু ২০টি ও আরসিসির ১১টি। নির্মাণ হয়েছে ৪৫টি কালভার্টও। এ ছাড়া ধলেশ্বরী-১ ও ধলেশ্বরী-২ এবং আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর তিনটি বড় সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ হয়েছে আবদুল্লাহপুর, হাঁসারা, শ্রীনগর, কদমতলী, পুলিয়া বাজার ও ভাঙ্গা ফ্লাইওভার। এ ছাড়া জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আতাদিতে ৪টি রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রেট সেপারেটর হিসেবে ১৫টি আন্ডারপাস ও ৩টি ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হয়েছে যাত্রাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ও ভাঙ্গায়। এক্সপ্রেসওয়ের দুই প্রান্তে ২টি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে বুধবার ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত এই এক্সপ্রেসওয়ে ঘুরে করে দেখা গেছে, এখনো এই মহাসড়কের টুকিটাকি কাজ সম্পন্ন করতে চলছে ব্যস্ততা। মহাসড়কের বিভিন্নস্থানের কোথাও চলছে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড স্থাপনের কাজ, কোথাও রঙ করা হচ্ছে, আর কোথাওবা ঘষামাজা চলছে। এই আন্তর্জাতিক এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক উচ্ছাসের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদকর্মী সাইফুল্লাহ শামীম বলেন, এই এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ার পর এই অঞ্চলের শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, সার্বিক উন্নতি সাধিত হবে। এতে ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্পকারখানা স্থাপনে উদ্যোক্তারা আগ্রহী হবেন। এতে আমাদের কর্মসংস্থানও বেড়ে যাবে। সার্বিকভাবে দেশের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিতে এই এক্সপ্রেসওয়ে বড় ভুমিকা রাখবে। আনোয়ার আলী নামে একজন ট্রাক চালক বলেন, এটি চালু হওয়ায় আমরা অনেক খুশি। এখন আর আগের মতো আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চালাতে হবেনা।

ফরিদপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রকিবুল বারী বলেন, এই এক্সপ্রেসওয়ে হওয়াতে রাজধানী ঢাকার সাথে এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হবে। এই এক্সপ্রেসওয়ে হওয়াতে এই মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। সড়কের যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, উন্নয়নের প্রথম শর্তই হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মিত হয়েছে। এটি চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হলো। তিনি বলেন, আগে ঢাকা যেতে যে সময় লাগতো এখন তার চার ভাগের একভাগ সময় লাগবে। এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক খাত সমৃদ্ধ হবে। জনগণও ব্যাপক উপকৃত হবে।