Sun. Feb 23rd, 2020

ফরিদপুরের ঐতিহাসিক করিমপুর যুদ্ধদিবস

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর টাইমসঃ
মহান মুক্তিযুদ্ধে ৭১ এর ৯ ডিসেম্বর ফরিদপুর সদরের সবচেয়ে বড় রক্ষক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিলো কানাইপুর ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামে। এ যুদ্ধে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামবাসীদের ঘরে আশ্রয় নিলে তাদের নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়ায় পাকসেনারা চারজন গ্রামবাসীকেও হত্যা করে। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও ঐতিহাসিক এই করিমপুর যুদ্ধের কোন স্মৃতিচিহ্ন নেই সেখানে।
করিমপুর যুদ্ধে শহীদ হওয়া সাত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হলেন – কাজী সালাউদ্দিন, মেজবাহউদ্দিন নৌফেল, আব্দুল ওয়াহাব, সোহরাব হোসেন, আব্দুল আওয়াল, আব্দুল হামিদ ও মজিবুর রহমান। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ায় যাদের হত্যা করা হয় তারা হলেন ওই গ্রামের বাকেল উদ্দীন মন্ডল, হযরত উদ্দীন মন্ডল, হাশেম আলী মন্ডল ও আবু খাঁ।
ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আমিনুর রহমান ফরিদ বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর আসে পাক বাহিনীর একটি জিপ গাড়ী ও একটি ট্রাক ফরিদপুর ধোপাডাঙ্গা চাঁদপুরের দিকে আসছে। তাতে রাজাকারদের জন্য চাউল-আটা, রসদ ও অস্ত্র আনা হচ্ছে। এ খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা কাজী সালাউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। অপর দিকে বোয়ালমারীর নতুবদিয়া ক্যাম্প থেকে হেমায়েতউদ্দীন তালুকদারের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ এবং গোরদিয়া ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াসের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ পাক হানাদার বাহিনীর ও রাজাকারদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
করিমপুর ব্রিজের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রেনেড ছুড়ে পাকসেনাদের একটি জিপগাড়ি উড়িয়ে দেন। এরপর পাকবাহিনীর একটি বড় যুদ্ধ বহর সেখানে পৌঁছালে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা তিন-চার ভাগে বিভক্ত হয়ে গুলি করতে করতে পিছু হটে করিমপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। পাকবাহিনী গ্রামটি ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় নেওয়া বাড়িতে হানাদাররা আগুন ধরিয়ে দিলে সাত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
যুদ্ধ শেষে পরের দিন ১০ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী করিমপুর এলাকার বাড়ীঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ১৭ ডিসেম্বর ফরিদপুর স্বাধীন হলে করিমপুর থেকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ সংগ্রহ করে শহরের আলীপুর কবরস্থানে যথাযথ মর্যাদায় দাফন করা হয়।
ফরিদপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবুল ফয়েজ মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, দেশ স্বাধীনের পর প্রায় অর্ধশতক পেরিয়ে যাচ্ছে। এখনও করিমপুরে একটি স্মৃতিসৌধ না হওয়া আমাদের জন্য লজ্জাকর।

বোয়ালমারী মুক্ত দিবস:


মুক্তিযুদ্ধকালে পাক সেনারা বোয়ালমারী উপজেলার হাসপাতালে ঘাটি স্থাপন করে। ১৯৭১ সালের ০৯ ডিসেম্বর পাক বাহিনী বোয়ালমারী থেকে পিছু হটে ফরিদপুরের দিকে মার্চ করে। এসময় এতদাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের মজুরদিয়া এলাকায় অবরোধের চেষ্টা চালায়। সেখানে শত্রুপক্ষের পুতে রাখা মাইন বিষ্ফোরনে আহত হয়ে পা হারান মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবী, পাকসেনারা বোয়ালমারীর বিভিন্ন জায়গা থেকে নারী পুরুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করে গণকবর দিতো একটি ডোবায়। বোয়ালমারী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে একাধিক গণকবর থাকলেও তা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি আজো।
উপজেলা চেয়ারম্যান এম এম মোশাররফ হোসেন মনে করেন, সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের স্থানসহ গণকবরগুলো চিহ্নিত করে সেখানে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সম্বলিত স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিফলক নির্মান করা গেলে চেতনা ছড়িয়ে পড়বে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে। এলক্ষ্যে বোয়ালমারীর গণকবরগুলো চিহ্নিত করে অবিলম্বে স্মৃতিফলক নির্মান ও মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে।