Sun. Dec 15th, 2019

ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে শ্রী অঙ্গনে সেবায়েতের আত্মাহুতিতে তোলপাড়

বন্ধু সেবক। পাশে ফেসবুকে দেয়া তার স্ট্যাটাস।

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর টাইমস:
ফরিদপুরের গোয়ালচামটে অবস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান শ্রী ধাম শ্রী অঙ্গন থেকে মহানাম সম্প্রদায়ের এক সেবায়েতের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। আত্মহত্যার আগে তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসও দিয়ে গেছেন। সেখানে এই শ্রী অঙ্গণের বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ করেন তিনি।
৪৪ বছর বয়সী নিহত ওই সেবায়েতের নাম বন্ধু সেবক। তার আসল নাম শৈলেন বর্মন। তিনি পঞ্চগড় জেলার দেবিগঞ্জ উপজেলার দেবিডুবা ইউনিয়নের সরকোরপাড়া গ্রামের মৃত সিদ্ধি বর্মনের ছেলে। তিন ভাইবোনদের মধ্যে শৈলেন সবার ছোট ছিলেন। প্রায় ২৫ বছর আগে তিনি ফরিদপুরে এসে শ্রীধাম শ্রী অঙ্গনে ব্রক্ষচারীর জীবন গ্রহণ করেন। তিনি ফরিদপুরের এই শ্রী অঙ্গনের মহানাম সম্প্রদায় কমিটির সহ-সেবায়েত ছিলেন। এর আগে তিনি এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে ভোর ৪টা ৩২ মিনিটে বন্ধু সেবকের নিজস্ব ফেসবুক আইডি থেকে (বন্ধু সেবক) ‘‘জীবনের শেষ লেখা শেষ কথা” শীর্ষক স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, এ ভাবে পৃথিবী ছেড়ে যাবার কথা ছিল না। পরিস্থিতির কারণে যেতে হচ্ছে। কলংক মৃত্যুর সমান মনে করি। এর জন্য দায়ি শ্রী অঙ্গন মহানাম সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক বিজ্ঞান বন্ধু (৪৮)। তারই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। দুই নারীকে আমার বিরুদ্ধে ব্যাবহার করা হয়েছে ব্যাক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে।’’
শ্রী অঙ্গণের নাইটগার্ড সাগর জানান, আজ সোমবার (২৫ নভেম্বর) ভোররাত পৌনে পাঁচটার দিকে মঙ্গল আড়তি দিতে তিনি বন্ধু সেবক ব্রক্ষাচারীর কক্ষের কড়া নাড়েন তাকে ডাকতে। কিন্তু কোন সাড়া না পেলে জানালার কাঁচের পাল্লা সরিয়ে দেখেন তার মৃতদেহ ঝুলছে। এরপর তিনি অন্যান্যদের খবর দেন।
সুদর্শণ বন্ধু নামে সেখানকার এক বাসিন্দা জানান, ভোর রাত ৪টা ৩২ মিনিটে বন্ধু সেবক ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। তিনি জানান, বন্ধু সেবক সৎ ও নির্ভিক ছিলেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে মিথ্যা নারীঘটিত একটি অপবাদ দেয়া হয়। গত শনিবার এ নিয়ে একটি সভাও হয় সেখানে অবস্থানরত সাধুদের। ওই সভায় বন্ধু সেবককে শ্রী অঙ্গন ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এনিয়ে গত কয়েকদিন শ্রী ধামে নানা কথা চলছিলো। এ অবস্থায় গতকাল রোববার দিবাগত রাতেও সাধুদের ডেকে নিয়ে সেবক বন্ধু বিরুদ্ধে নানান কথা বলেন সাধারণ সম্পাদক বিজ্ঞান বন্ধু। মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে না পেরেই তিনি আত্মাহুতি দিয়েছেন।
সরেজমিনে খবর সংগ্রহে সেখানে গেলে সাধু ও সেবায়েতগণ দাবি করেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়েই বন্ধু সেবককে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে। এর সঠিক বিচার না হলে আমরাও সকলে জীবনহুতি দেবো। এসময় সেখানে সাধারণ নারী-পুরুষদেরও দেখা যায় ঘটনাটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে।
এদিকে এভাবে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বন্ধু সেবকের আত্ম হননের ঘটনায় সেখানে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সেবক বন্ধুর লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে দেশের বিভিন্ন আশ্রম ও ধাম থেকে সাধু ও সেবায়েতগণ ফরিদপুরের শ্রী অঙ্গণে আসতে থাকেন।
বন্ধু সেবকের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিজ্ঞান বন্ধু বলেন, আমি শুনেছি তিনি ফেসবুকে তাকে জড়িয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে গেছেন। এতে আমার বিপদ হতে পারে। তিনি বন্ধু সেবককে একজন চরিত্রহীন ব্যাক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, তিনি তার নিজ কক্ষে নারীদের নিয়ে যেতেন। তিনি বলেন, যে সব সেবায়েত এ মন্দিরে রয়েছে তদের সকলকে টাকা দিয়ে বশ করেছেন বন্ধু সেবক। তাই তারা সকলে আমার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। প্রতিষ্ঠান চালতে গেলে কঠোর হতেই হয় এজন্য নিবাসীরা তাকে পছন্দ করে না।
ফরিদপুর কোতয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বেলাল হোসেন বলেন, এ ব্যাপারে গতকাল দুপুরে থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলাদায়ের করা হয়েছে। এ মামলার বাদী হয়েছেন মহানাম সম্প্রদায়ের সভাপতি কান্তি বন্ধু ব্রহ্মচারী। আসামী করা হয়েছে সাধারণ সম্পাদক বিজ্ঞান বন্ধু, ও দুই মেহন্ত সুচিত্রা মহন্ত (৩৪) ও চায়না মহন্ত (২৬)।

ফেসবুকে যা লিখে গেছেন সেবক বন্ধু:

‘‘জয় জগদ্বন্ধু হরি
শ্রী ধাম শ্রী অঙ্গণ ফরিদপুর।
জীবনের শেষ লেখা শেষ কথাঃ
এভাবে পৃথিবী ছেড়ে যাবার কথা ছিলো না। পরিস্থিতির কারণে যেতে হচ্ছে। কলঙ্ককে মৃত্যুর সমান মনে করি। এর জন্য দায়ী শ্রী অঙ্গণ মহানাম সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক বিজ্ঞান বন্ধু।
তারই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। দুই নারীকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল চিত্তের মানুষ। অনুরোধ করবো দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলুন। জেগে উঠুন। বহুমুখী গণতন্ত্রের ভিত্তিতে সংগঠন গড়ে তুলুন।
আমার আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে শ্রী অঙ্গণের ও সম্প্রদায়ের মধ্যকার আসুরিক শক্তির বিনাশ ঘটুক। শুভ শক্তির উদ্বোধন হোক জাগরণ ঘটুক এই কামনা করি।প্রভুর নাম স্মরণ করতে করতে ফাঁসির দড়ি গ্রহণ করবো এবং নাম করতে করতে চলে যাবো। পাপ পূণ্য কোনটাই আমাকে স্পর্শ করবে না আমার বিশ্বাস।
জয় জগদ্বন্ধু হরি।
বন্ধু সেবক।’’