ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে কাঙ্খিত সেবা পায়না রোগী, মিলেনা ওষুধ

আহম্মদ ফিরোজ: 

ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র্র দক্ষিণ কালীবাড়িতে মুজিব সড়ক ঘেঁষে অবস্থিত ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল। ১৯১৭ সালে প্রায় সাড়ে তিন একর জমির ওপর দাতব্য চিকিৎসালয় হিসেবে ২৫ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে এটি যাত্রা শুরু করে। কালের বিবর্তনে সেটিই এখন ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল। ১৯৮৬ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। শহরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় শহরবাসী রোগ-শোক, বিপদে-আপদে সবার আগে এ হাসপাতালেই ছুটে আসেন।

তবে জনবলসহ নানাবিধ সঙ্কটের কারণে এ হাসপাতালে এসে রোগীরা কাক্সিক্ষত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই। অভিযোগ রয়েছে রোগীদের দেয়া হয় না সরকারি ওষুধ। হাসপাতালে দিনের বেলায় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের পদচারণা বিরক্তির পর্যায়ে পৌঁছে। সেই সাথে রয়েছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ভাগিয়ে নিতে প্রাইভেট ক্লিনিকের দালালদের বিচরণ। নির্ধারিত সময়ে বড় ডাক্তারদের হাসপাতালে পাওয়া যায় না বলে এমন অভিযোগও শোনা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা পর্যায়ের পদ রয়েছে ৩৬টি। এর মধ্যে ১৭টি পদই শূন্য রয়েছে। হাসপাতালের অর্থো সার্জারি, সার্জারি এবং চর্ম ও যৌন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদ তিনটি শূন্য রয়েছে। সিনিয়র কনসালট্যান্টের ছয়টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন তিনজন। ছয়জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন চারজন। চক্ষু ও প্যাথলজি বিভাগে কোনো জুনিয়র কনসালট্যান্ট নেই।

হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসারদের মধ্যে অ্যানেসথেসিস্ট, প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের একটি করে পদ থাকলেও সেগুলো শূন্য রয়েছে। সহকারী রেজিস্ট্রার (গাইনি), সহকারী রেজিস্ট্রার (সার্জারি), সহকারী রেজিস্ট্রারের (মেডিসিন) দুটি করে পদ থাকলেও দুটিই শূন্য রয়েছে। ইএমও পদে চারজনের স্থলে দু’জন, সাতজন মেডিক্যাল অফিসারের জায়গায় কর্মরত রয়েছেন ছয়জন।
অপরদিকে কর্মচারী পর্যায়ে ১৩৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১০৫ জন। শূন্য রয়েছে ৩২টি পদ। অর্থাৎ কর্মচারী পর্যায়ে ৩০ ভাগ পদ শূন্য রয়েছে।

এ হাসপাতালে নৈশপ্রহরী পদে কোনো লোক নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নৈশপ্রহরী না থাকায় প্রায়ই হাসপাতালে চুরি, ছিনতাইসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে।
হাসপাতালের শিশু বিভাগে দেখা গেছে, শতাধিক চিকিৎসাপ্রার্থী শিশুকে নিয়ে এসেছেন তাদের অভিভাবকরা। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এসব রোগীর জন্য এক মিনিটও সময় দিতে পারছেন না। লাইন ধরে রোগী যাচ্ছে, রোগের বর্ণনা শুনেই ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছেন ডাক্তারের সহকারীরা।

হাসপাতালের কয়েকজন সিনিয়র চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে হাসপাতালে এসে হাজিরা দিয়ে বের হয়ে যান। সকাল ১০টার দিকে ফিরে এলেও ১১টার মধ্যে তাদের আর হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক চিকিৎসক বেলা ১টার সময় বের হয়ে গিয়ে আর ফিরে আসেন না। দু’জন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা হাসপাতালের পাশাপাশি ওই সময়ে বিভিন্ন ক্লিনিকে গিয়ে রোগী দেখেন। ক্লিনিক ও হাসপাতালে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়েই তাদের সময় কাটে। কোনো জটিল রোগীকে এ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ফরিদপুর মেডিক্যাল হাসপাতালে রেফার করা হয়।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) গণেশ চন্দ্র আগারওয়ালা জানান, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার সুযোগ বেশি। সেখানে রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক যন্ত্রপাতি। এ জন্য সে হাসপাতালে জটিল রোগীদের স্থানান্তরের পরামর্শ দেয়া হয়।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা সিভিল সার্জন ডা: এনামুল হক বলেন, শতাব্দী প্রাচীন এই জেনারেল হাসপাতালে কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে ডাক্তার ও অন্যান্য জনবলের বিপরীতে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অভিযোগ শুনতে হয় বেশি। কিছু চিকিৎসকের হাসপাতালে ডিউটির সময়ে বাইরের ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে রোগী দেখার অভিযোগ স্বীকার করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বার বার তাদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে। আর সরকারি যেসব ওষুধ বরাদ্দ থাকে তাতো রোগীদের দেয়াই হয়। হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এক শ্রেণীর চিকিৎসকের প্রশ্রয়েই তারা আসছেন।