Mon. Oct 14th, 2019

বোয়ালমারীতে ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পে দুর্নীতি

আহম্মদ ফিরোজ, ফরিদপুর টাইমস: (১৯ এপ্রিল ২০১৯ শুক্রবার)

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, এসব ঘর পেতে তাদেরকে ১০ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে। তবে সরকার যে টাকা বরাদ্দ করেছে তার চেয়েও অনেক কম টাকায় এসব ঘর নির্মাণ করার মাত্র কয়েক মাসেই অনেকের ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব ঘরে বসবাস করতে পারছেন না তারা।

জানা গেছে, প্রকল্প-২ এর আওতায় বোয়ালমারী উপজেলায় দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২৫ জনের একটি তালিকার অনুমোদন দেয়া হয় গত বছরের ২৫ মে। তার আগে প্রথম দফায় আরো ১৪৬ জনকে এ প্রকল্পের আওতায় ঘর তুলে দেয়া হয়। সবমিলিয়ে বোয়ালমারী উপজেলায় ৩৭১টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরের জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল ১ লাখ টাকা।

ঘরে ১২ ফুটের ১২টি পিলার ও ১০ ফুটের ৯টি পিলার লাগানোর কথা থাকলেও পিলার লাগানো হয়েছে এক ফুট কম করে। চার ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পিলার দেয়ার কথা থাকলেও সেখানে দেয়া হয়েছে ৩ ইঞ্চি পিলার। পিলারে ৬ মিলি রডের পরিবর্তে দেয়া হয়েছে ৪ মিলি রড। ঘরের মেঝে ৩ ইঞ্চির স্থানে দেড় ইঞ্চি ঢালাই দেয়া হয়েছে। ৬টির স্থানে ৪টি জানালা দেয়া হয়েছে। পায়খানায় ৮টি রিং বসানোর কথা থাকলেও ৬টি রিং বসানো হয়েছে। ডোয়া থেকে ৬ ইঞ্চি করে চাপিয়ে দুই পাশে এক ফুট করে ছোট করে দেয়া হয়েছে ঘর। ডোয়ার ইটের গাঁথুনির জন্য মাটি কাটা হয়নি। উপর থেকেই ডোয়া দেয়া হয়েছে। মাত্র ৩৯৫টি ইট আর ৫ বস্তা সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে পুরো ঘরের কাজে। দায়সারাভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে টিন ও রাজ মিস্ত্রির কাজ।

বোয়ালমারীর ঘোষপুর ইউনিয়নের শেলাহাটি গ্রামের মৃত মেহেরুজ্জামানের স্ত্রী হুরি বেগম (৬০) বলেন, মাত্র ৪-৫ মাস আগে তার ঘর বানানো হয়েছে। এরই মধ্যে ঘরের দু’টি আড়া ফেটে গেছে। ঘরের মেঝেতে মাঝ বরাবর বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি এলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে চাল-ডালসহ সব জিনিস ভিজে যায়। পায়খানায় ৮টি রিং বসানোর কথা থাকলেও বসানো হয়েছে মাত্র ৬টি। হুরি বেগমের ভাষায়, ‘ঝিপুতপান (বাচ্চারা) ছাড়া সেহানে বড়রা কেউ যাইতে পারে না।’ তিনিও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১০ হাজার টাকা উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ করেন।

একই গ্রামের মরহুম রোকনউদ্দিনের স্ত্রী ফুলজান নেছা (৭০) অভিযোগ করেন, ঘরের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। অথচ এহন ঘরের নামে খোপ বানায় দিছে। টিনের লোহা খুইল্যা পড়তিছে। বৃষ্টি হলি ঘরের মধ্যে গবগবাইয়্যা পানি পড়ে। পায়খানা এত ছোট যে তার মধ্যি বসা যায় না।

মরহুম সামছেল শেখের স্ত্রী ছাহেরা বানু (৬০) বলেন, পরের বাসায় কাজ কইর্যা চাইয়্যা চিন্ত্যা ঋণ কইর্যা, ভিক্ষ্যা কইর্যা ১০ হাজার টাকা জোগাড় কইর্যা দিছি। কিন্তু এহন ঘরের জানালা খসানো যায় না। দরজার কপাট লাগানো যায় না।

ঘোষপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের মেম্বার খলিলুর রহমান জানান, তারাই এলাকার দুস্থ ও হতদরিদ্রদের ঘর নির্মাণের জন্য তালিকা তৈরি করেন। তবে ঘর নির্মাণকাজে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এখন সকাল-বিকাল এসব ব্যাপারে অভিযোগ শুনতে হচ্ছে তাদের। ঘর তৈরির জন্য উপজেলা নির্বাহী ও পিআইসি কর্মকর্তাকে ১০ হাজার টাকা উৎকোচ দেয়ার অভিযোগ তিনিও জেনেছেন বলে জানান।

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন অবশ্য তার বিরুদ্ধে ঘরপ্রাপ্তদের উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ সঠিক নয় জানিয়ে বলেন এসব ঘর নিয়মানুযায়ীই তৈরি করা হয়েছে। একসাথে অনেক কাঠ কেনা হয়েছে বলে কিছু কিছু ঘরের কাঠের আড়া ফেটে যেতে পারে। তিনি কারো অভিযোগ থাকলে সরেজমিন দেখতে যাবেন বলে জানান। যাদের ঘরে সমস্যা হবে তাদের ঘর মেরামত করে দেয়া হবে। এই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত টাকার কিছুই উদ্বৃত্ত হিসেবে ফেরত যায়নি বলেও তিনি জানান।