প্রসঙ্গ : মঙ্গল শোভাযাত্রা

আলী আকবর:

আমাদের বাঙ্গালী জীবনে বৈশাখী উৎসব মোটেও নতুন নয়, বরং তা হাজার বছরের পুরনো বললে ভুল হবে না। বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরা একসময় তাদের নিজস্ব হিসাব অনুসারে যে বছর গুনতো সেটা এখনকার বাংলা সনের মুলভিত্তি। এটা ইতিহাসসৃত পুরনো কথা। কৃষি নির্ভর এই জনপদে সূর্য উদয় ও অস্ত যাওয়ার সময় ধরে মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করতো। তাদের কাছে বছরের প্রথম দিনটার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। সেই বিচারে বর্ষ উৎসব একটি ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতিও বটে। তবে আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলাকে ফসলি সন হিসেবে রাস্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তা ছিল বাংলা ভাষার ভাষার মত নিম্নবর্গের মানুষের সন বা উৎসব। আর এখনকার বৈশাখে যে মাতামাতি যোগ হয়েছে তা হাল আমলের কথিত ‘দিবস’ পালনকারীদের দ্বারা । বাংলা সনের ইতিহাস নিয়ে যদি পর্যালোচনা করা যায় তাহলে বাংলা ভাষা ও বাংলা সনের যে একটা সংগ্রামী জীবন আছে বা ছিল তা পরিষ্কার হবে। আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখের যে বিশেষ আবেদন তার মধ্যে অতীতে বাংলা সন অনুসারীদের সংগ্রামী ইতিহাস জানাটা অন্যতম । এখনতো উপলক্ষ্যের দাপটে লক্ষ্যই হারিয়ে গেছে , স্বাভাবিক রীতিনীতির বদলে আড়ম্বরতার প্রবল প্রভাব আর উৎসবের নামে চলছে ভন্ডামী। আমরা সংস্কৃতির দেওলিয়াপনায় পশ্চাৎপদ জাতিতে পরিনত হচ্ছি অজানা আয়েশে-খায়েশে।

আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো পহেলা বৈশাখ এলেই একটা বিশাল মঙ্গল যাত্রার আয়োজন হয় । ঐ মঙ্গল যাত্রাই এখন পহেলা বৈশাখের মুল প্রতিপাদ্যের দাবিদার বলা চলে। পাশাপাশি এই মঙ্গল শোভাযাত্রার গলায় একটা আন্তজার্তিক স্বীকৃতিও জুটে গেছে। আমাদের এত ঐতিহ্য থাকতে এই ভিত্তিহীন ব্যাপারটা তাদের চোখে পড়লো?

আমাদের বৈশাখী উৎসবের অংশ তো গ্রামীণ মেলা, হালখাতা, পল্লী বালাদের দেয়ার গান। কই তাতো চোখে পড়ে এখন?
একসময় গ্রামের বিশেষ বটতলায় মেলা বসতো। বাউলদের আস্তানায় আর বিত্তশালী সৈখিন মানুষেরা আয়োজন করতো মেলা, এতে থাকতো লোকজ জীবনের যত উপকরণ। প্রতিযোগীতা হতো ঘৌড়দৌড় ও ঘুড়ি উৎসবের । এসব মেলায় জীবনের একটা বিশেষ আকর্ষন ছিল এবং এখনও আছে । শহর থেকে মানুষ গ্রামে আসতো মেলা দেখতে। নেমন্ত্রণ পেত আত্মীয়স্বজনেরা। তবে পান্তা ইলিশের পর্বটা কখনই আমাদের উৎসব ছিল না। এসব হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো ফিরিয়ে আনতে আমরা এখনো উদ্যোগী হতে পারিনি। বরং বৈশাখ নিয়ে বাড়াবাড়ি আর মাতামাতি অন্ত নেই। অপরদিকে একশ্রেণীর মানুষ এটাকে বিজাতীয়, বা আকাশ সংস্কৃতির তকমা দিতেও দ্বিধা বোধ করছে না।

আমরা উৎসবের নামে তেলেসমাতি কারবার দেখছি। দেখতে পাচ্ছি বিশ্বায়নের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। মোবাইল ও সিম কোম্পানিসহ সমস্ত মার্কেটিং কোম্পানিগুলো এমন কি বাজারের হারপিক দোকানিরাও যথাতথা কলরেট আর অফারের নামে সুবিধা দেয়ার ধান্দায় নেমেছে। ওদের কাছে উৎসবের শেষ নেই, যেন বার মাসে তের পুজো।

চিরায়ত বাঙ্গালী জীবনে পান্তা ইলিশ খাওয়ার কোন রীতি -রেওয়াজ ছিল বলে ইতিহাসবেত্তারা প্রমাণ করতে পারেননি।
ইলিশ খাওয়ার নামে এর দাম সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে নেয়াতো তথাকথিত ‘একদিনের বাঙ্গালী বাবু’র কাজ এবং একশ্রেণী অসাধু ব্যবসায়ীদের কাজ।
বৈশাখী মেলায় এক সমযের আকর্ষন ছিল কুটিরশিল্প, কারুশিল্পের পণ্য প্রদর্শন ও বেচাকেনা। এই শিল্পের উদ্যোক্তারা বা যারা এ শিল্পে জীবিকানির্বাহ করে এমন মানুষের সামনে বৈশাখী অফারে আরএফএল কিনে বড় বাঙ্গালীয়ানা মুডে আছি আমরা।
তবে কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনও টিকে আছে হালখাতার ব্যবহার।

অসাম্প্রদায়িকতার চাদরে মোড়ানো মঙ্গল শোভাযাত্রার সাম্প্রদায়িক দিক নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে এখন। ১৯৮৬ সালে যশোরে চালু হওয়া সেই সময়ের বৈশাখী আনন্দ শোভাযাত্রাই এখনকার মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই শোভাযাত্রা সম্পর্কে জানা না থাকলেও তার আদলে চালু হওয়া চারুকলার এই শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য ও উপাদান নিয়ে দু- চারটি কথা না বললেই নয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমরা যে প্রতীকগুলো দেখছি তা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে সনাতন ধর্মের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ। একে কিভাবে অসাম্প্রদায়িক বলি? শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকা পেঁচার কথাই ধরি
এটা পুরাণা বিশ্বাসে সম্পদ ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষীর বাহক। একইভাবে বাঘ ও সিংহ দেবী দূর্গার বাহন। ময়ুর তো দেব সেনাপতি কার্তিকের বাহন।আবার গনেশের বাহন ইদুর ও গনেশের মুখায়ব হাতির দেখা এখন মঙ্গল শোভাযাত্রায় কেন?
মন্দিরের গেট বা দেয়ালে সিংহ হাতির মুর্তি বা আলপনার দৃশ্য দেখা গেলেও বাঙ্গালী মুসলমানরাতো এটাকে ভিন্নধর্মের প্রতীক হিসাবে চেনে। এতে মুসলিম মানসপটের কোন দৃশ্য চোখে পড়াতো দুরে থাক, বরং যা দেখি তা মুসলিম বিশ্বাসের পরিপন্থীও বটে।
তারপরও তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতার তকমা লাগিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে অশুভ আর অকল্যাণ দুর করতে উদীচি ও চারুকলা যে ঝাড়ঁফুক করছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

📌লেখক, শিক্ষার্থী
সরকারী রাজেন্দ্র কলেজ,ফরিদপুর।

লেখাটি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া।