বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ফরিদপুরে

ফরিদপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হলে অত্রাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সামনে উচ্চ শিক্ষার বিরাট দুয়ার উম্মোচিত হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য এতদঅঞ্চলের মানুষের গণদাবি দীর্ঘদিনের। খবর ডেইলী বাংলাদেশ।

বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে ফরিদপুর সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই সুযোগ্য উত্তরসূরী দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন ফরিদপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ প্রতিশ্রুতি শিঘ্রই বাস্তবায়ন হবে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, প্রাচীন জেলা ফরিদপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। ’৯৬ সালে এ দাবিতে একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি রাজেন্দ্র কলে কেন্দ্রিক। সেসময়ে রাজেন্দ্র কলেজের সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৎপরতা শুরু হয়। অবশ্য সেসময়ে রাজেন্দ্র কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার দাবিই উচ্চকিত ছিলো। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজেন্দ্র কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হলে সেটি অত্রাঞ্চলের সিংহভাগ শিক্ষার্থীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না বলেই মনে করা হয়। এজন্য নতুন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি রাজেন্দ্র কলেজের বিদ্যমান সংকটেরও দিকেও দৃষ্টি দেয়ার দাবি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ, রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক রানা চৌধুরী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পক্ষপাতি। তিনি বলেন, যত বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হবে, দেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ তত বেশি প্রসার হবে। একইসঙ্গে এটি জনগণের জন্যও সহজলভ্য হবে।

ফরিদপুরের আরেক শিক্ষাবীদ, রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক অধ্যাপক আব্দুস সামাদ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ফরিদপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হতে যাচ্ছে এটিই বড় কথা। সরকার মনে করলে উপযুক্ত শিক্ষক ও জনবল নিযুক্ত করে রাজেন্দ্র কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে পারে। আবার আলাদাভাবে পাবরিক বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়তে পারে। বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করছে।

এ ব্যাপারে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ সৈয়দ মোশার্রফ আলী অবশ্য রাজেন্দ্র কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হলে অত্রাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না বলে মনে করেন। তিনি ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, রাজেন্দ্র কলেজে বর্তমানে ৩২ হাজারের মতো শিক্ষার্থী শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হলে এখানকার এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এভাবে অধ্যয়নের সুযোগ পাবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বরিশালের বিএম কলেজ এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার ব্যাপারে সৃষ্ট জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। অধ্যক্ষ মোশার্রফ আলী বলেন, বিএম কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে চাইলে সেখানকার স্থানীয়রা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে। আর জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে গেলে বিরাট জটিলতার সৃষ্টি হয়। এজন্য তিনি রাজেন্দ্র কলেজের পরিবর্তে ফরিদপুরে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারেই তার মতামত দেন।

এব্যাপারে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্রছাত্রী সংসদ রুকসুর নির্বাচিত ভিপি নূর হোসেন মারুফ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ফরিদপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও একাধিকবারের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন তার নির্বাচনী ইশতেহারে ফরিদপুরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই কাজ অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়েছে। ফরিদপুরকে সিটি কর্পোরেশন করার পর এটি ববাস্তবায়ন হবে। রাজেন্দ্র কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে রুকসুর এই ভিপি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চাইবে না তাদের কোনো ক্যাম্পাসে পাবলিক বিশ্ববিদালয় হোক। জগন্নাথ কলেজ ও বিএম কলেজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রাজেন্দ্র কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হলে ৪০ হাজার শিক্ষার্থীদের মাঝে এখানকার ২ থেকে ৩ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশুনা করতে পারবে। বাকি শিক্ষার্থীরা কোথাও যাবে? এজন্য রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যমান সংকট নিরসণেও বিশেষ নজর দেয়া জরুরি।

১৯১৮ সালে স্থাপিত হওয়ার পর বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ বর্তমানে অত্রাঞ্চলের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ১৯টি বিষয়ে এখানে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজারের মতো। বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ১৬৯ জন। কলেজে ছাত্রীদের ৩টি ও ছাত্রদের ৫টি আবাসিক হল রয়েছে। এর মধ্যে দু’টি বৃহৎ আবাসিক হল স্থাপন হয়েছে সম্প্রতি। তবে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ডাইনিংএর সমস্যা রয়েছে। কলেজের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য বাস রয়েছে ৬টি। আর শিক্ষকদের জন্য রয়েছে দু’টি মাইক্রোবাস।

রাজেন্দ্র কলেজের বর্তমান ও সাবেক একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ফরিদপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরি। পাশাপাশি প্রায় সাড়ে ২০ একর জমির উপর দু’টি ক্যাম্পাস নিয়ে গড়ে ওঠা রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক, নতুন বিভাগ ও ডাইনিংসহ কলেজের আবাসিক সুবিধাও সৃষ্টি করা অত্যন্ত দরকার। রাজেন্দ্র কলেজের এসব সংকটের নিরসণ না করে এখানে আরেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুললে সেক্ষেত্রে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের অভিযোগ উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজেন্দ্র কলেজের পূর্বাপর শিক্ষার মান ধরে বজায় রাখাও কষ্টকর হবে। এজন্য ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার পাশাপাশি রাজেন্দ্র কলেজের সার্বিক উন্নয়নেও নজর দেয়া উচিত বলে তাদের অভিমত।

https://m.daily-bangladesh.com/%C2%A0বিশ্ববিদ্যালয়-হচ্ছে-ফরিদপুরে/93695