পদ্মায় নাব্যতাসঙ্কট : আটকা পড়েছে অর্ধশত পণ্যবাহী নৌযান

আহম্মদ ফিরোজ, ফরিদপুর টাইমস: (০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ বৃহস্পতিবার)

পদ্মা নদীতে নাব্যতাসঙ্কট এবং নদীর মাঝে জেগে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য ডুবোচরে ফরিদপুর নৌ বন্দরমুখী পণ্যবাহী অর্ধশত জাহাজ, কার্গো ও ট্রলার আটকা পড়েছে। প্রায় এক মাস যাবত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার পর ফরিদপুরে নৌবন্দরে ভেড়ার জন্য এসব নৌযান অপেক্ষা করছে। কিন্তু পদ্মা নদীতে পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকায় তারা বন্দরে ভিড়তে পারছে না। বন্দরের পন্টুন থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে হাজিগঞ্জে গত প্রায় এক সপ্তাহ যাবত নদীতে ড্রেজিং কাজ শুরু হয়েছে। তবে কবে নাগাদ এতে নৌপথের নতুন চ্যানেল সৃষ্টি হবে তা সঠিকভাবে বলতে পারছে না কেউ।
দেশের বিভিন্ন বন্দর থেকে নৌপথে বোরো মওসুমের সার, গম, সিমেন্ট, কয়লা, বালুসহ নানান পণ্য নিয়ে এসব নৌযান ফরিদপুর বন্দরের অদূরে গদাধরডাঙ্গিসহ চরভদ্রাসনের হাজিগঞ্জ ও জাকেরের সুরা এলাকায় পণ্যসমেত অবস্থান করছে।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে সাড়ে ৮০০ টন সার নিয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি জাকেরের সুরায় এসে আটকা পড়েছে এমভি মুগনি-১ নামে এমন একটি পণ্যবাহী কার্গো। এই নৌযানটির চালক মো: সাহাবউদ্দিন জানান, বন্দর পর্যন্ত পৌঁছতে হলে যে পরিমাণ পানি থাকা প্রয়োজন সেই পানি এখন নেই বলে আর এগোতে পারছেন না। তিনি বলেন, অন্তত পক্ষে ১০ হাত গভীর পানি থাকা প্রয়োজন ছিল কিন্তু সেখানে কোথাওবা দুই-তিন হাত পানি রয়েছে। এভাবে অরক্ষিত স্থানে পণ্যসহ কার্গো ভেড়ানোর ফলে তারা স্টাফসহ নিরাপত্তাহীনতায়ও রয়েছেন। এখন পণ্য খালাসে নানা রকম হয়রানি ছাড়াও পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে বলে জানান তিনি।

রবিউল ইসলাম নামে আরেকটি জাহাজের একজন ইঞ্জিনম্যান জানান, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সাড়ে ১০ হাজার বস্তা সার নিয়ে এসেছেন তিনি। গত তিন দিন ধরে তিনি হাজিগঞ্জে আটকা পড়েছেন। প্রতিদিনই তাদের মোটা অঙ্কের টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে। এতে তাদের যেসব দিন নষ্ট হচ্ছে সে জন্যতো মালিক তাদের অতিরিক্ত টাকা দেবেন না। এখন এই হাজিগঞ্জ থেকে মাল খালাস করার চিন্তাভাবনা করছি।

ফরিদপুর নৌবন্দরে কর্মরত মো: খায়রুজ্জামান নামে এক ব্যক্তি বলেন, বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ ও কার্গো আসতে না পারায় ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এখানকার কুলি শ্রমিকরাও বেকার দিন কাটাচ্ছেন। প্রায় আট হাজার কুলি শ্রমিক এই নৌবন্দর ঘিরে কাজ করেন বলে তিনি জানান। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে আরো ড্রেজিং মেশিন বসানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া বন্দরটিতে দু’টি পন্টুন তৈরির কাজ শুরু হলেও তা এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় সমস্যা হচ্ছে বলেও বলে জানান তিনি।

ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, দক্ষিণবঙ্গসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ব্যবসায়িক পণ্য আনা-নেয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ নৌবন্দর। বছরের পাঁচ মাসের মতো সময় এখানে পানি কম থাকে বলে বন্দরে পণ্য খালাসে জটিলতা সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি গত এক মাস যাবত পদ্মার বুকে যেই অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে সে জন্য বন্দরমুখী পণ্যবাহী প্রায় অর্ধশত জাহাজ ও কার্গো বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েছে। তিনি বলেন, ফরিদপুরের কুমার নদের উৎসমুখ খননে পদ্মার মদনখালী থেকে ৩০০ কোটি টাকার যে খনন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে সেই প্রকল্পও কোনো কাজে আসবে না, যদি পদ্মার বুকে পানি না থাকে।

ফরিদপুরের নৌবন্দরের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান রিয়াজ করপোরেশনের প্রতিনিধি নাফিজুল ইসলাম তাপস বলেন, আগে যেই দরে আমরা নদীর ঘাট ইজারা নিতাম এখন বন্দর হওয়ার পর তার চেয়ে তিনগুণ বেশি দরে ইজারা নিচ্ছি। কিন্তু এখন যদি পানিস্বল্পতার জন্য বন্দরে নৌযান ভিড়তে না পারে তাহলে তো আমাদের লাভ দূরের কথা উল্টো পথে বসতে হবে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া জানান, বন্দরটিকে সচল রাখতে নৌ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে জরিপ করেছে। আশা করছি আগামী দু’বছরের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হবে।

এ ব্যাপারে পোর্ট অফিসার শেখ মো: সেলিম রেজা বলেন, নাব্যতাসঙ্কট রয়েছে এটি ঠিক। তবে একেবারে যে নৌযান আসছে না, তা নয়। ছোট কার্গো ও জাহাজ ভিড়ছে। নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে একটি ড্রেজিং মেশিন কাজ করছে। তবে কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে তা সঠিক করে বলতে পারছি না।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে শত বছরের প্রাচীন ফরিদপুরের সিঅ্যান্ডবি ঘাটকে তৃতীয় শ্রেণীর নৌবন্দর হিসেবে গেজেট প্রকাশ করা হয়। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরসহ সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নৌপথে এই বন্দরে পণ্য আমদানি-রফতানি করা হয়। ফরিদপুরের সোনালি আঁশখ্যাত পাট এই বন্দর হয়েই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বহির্বিশ্বে রফতানি হয়। সিলেট থেকে কয়লা ও বালু ভারতের গরু ও চালসহ চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মিরকাদিম থেকে এই নৌপথেই চাল আমদানি হয়। নারায়ণগঞ্জ বন্দর থেকে সিমেন্টও এই পথেই আনা হয়। কিন্তু বর্তমানে পদ্মার বুকে নাব্যতা না থাকায় এবং নদীজুড়ে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় নৌবন্দরটি এক রকম অচল হয়ে পড়েছে।